
পহেলা বৈশাখ — বছরের সেই দিনটা যখন আমরা বাঙালিরা মনের গহীনে জমে থাকা হতাশাগুলোকে ঝেড়ে ফেলে রঙিন শাড়ি, পাঞ্জাবি আর হাসি মুখে রাস্তায় নেমে আসি। নতুন বছরে নতুন স্বপ্নের প্রত্যাশা। কিন্তু আমার জন্য সেই দিনটা ছিল একটু অন্যরকম। একটু বেশি রঙিন… আর একটু বেশি কাঁটায় ভরা।
হ্যাঁ, সেই পহেলা বৈশাখটা ছিল আমার জন্য অপ্রত্যাশিত। কারণ ওই দিনটাতে আমি নিজের ভেতরের দ্বৈত সত্তার সত্যকে মনের মধ্যে দৃঢ়ভাবে অনুভব করেছিলাম — আমি একজন বাইসেক্সুয়াল নারী। বাংলাদেশের মতো এক রক্ষণশীল সমাজে নিজের অস্তিত্ব মেনে নেওয়াটাই ছিল এক বিপ্লব।
সত্যিটা নিজের করে নেওয়া
বাইসেক্সুয়ালিটি… শব্দটা আমার কানে কেমন যেন অচেনা ঠেকত এক সময়। ছোটবেলায় শুনেছি ছেলেরা মেয়েদের ভালোবাসে, মেয়েরা ছেলেদের। কিন্তু আমি? আমি কেন দুই দিকেই আকৃষ্ট বোধ করতাম? শৈশবের সেই বিভ্রান্তি, মনের ভেতরের সেই টানাপোড়েন — সবকিছু যেন একটা বিশাল পাপ।
স্কুলের বান্ধবীদের দিকে তাকিয়ে মনের গভীরে যে অদ্ভুত আনন্দ হতো, সেটাকে আমি ভয় পেতাম। আর নামাজের সময় যখন আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতাম, তখন মনে হতো — আমি কি অভিশপ্ত? পরিবার, সমাজ, ধর্ম — সবাই যেন ঘুরে ঘুরে আমাকে অপরাধবোধে ভোগাচ্ছে।
কিন্তু সময়ের সাথে সাথে বুঝলাম, আমার অস্তিত্ব কোনো পাপ নয়। আমার ভালোবাসার অধিকার আছে — ছেলেকেই হোক বা মেয়েকে। কিন্তু সেই সত্যটা নিজের করে নেওয়ার পথটা ছিল কাঁটার বৃত্তে ঘেরা।
দ্বিমুখী মানসিকতার সাথে লড়াই

বাংলাদেশের রক্ষণশীল সমাজে নিজের সত্যকে মেনে নেওয়াটা যেন গলাটিপে ধরার মতো। সবচেয়ে বড় কথা হলো ধর্ম। ইসলামিক মূল্যবোধের ঘেরাটোপে আবদ্ধ আমাদের সমাজ। “বাইসেক্সুয়ালিটি haram” — এই এক লেবেল লাগিয়ে দিয়েছে সবাই।
আমার এক বান্ধবী বলেছিল, “তুই কি পাগল হয়েছিস? মেয়ে হয়ে মেয়ে পছন্দ করিস? তোকে আল্লাহ ক্ষমা করবে না!” আহা, সেই বান্ধবীটা তো নিজেও প্রেম করত এক ছেলের সাথে, কিন্তু আমার প্রেমে যেন পৃথিবী ধ্বংসের কারণ!
হিপোক্রিসি? হ্যাঁ, ধর্মের নামে যত নিষেধাজ্ঞা, তত বেশি আড়ালে চলে মিথ্যাচার। মুখে বড় বড় নসিহত, আর আড়ালে নিজেরাই নষ্টামি। সেই দ্বিমুখী মানসিকতা আমাকে প্রতিদিন তাড়া করত।
নিজের পরিচয়ে গর্বিত হও
পহেলা বৈশাখে নিজের সত্যকে মনের মধ্যে ধারণ করেছিলাম। সেটা শুধু আমার নয়, আরও অনেকের জন্যই ছিল একটা বড় পদক্ষেপ। আমি চাই, প্রতিটি নারী তার সত্যিটা নিয়ে গর্ব করুক। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ আর ধর্মীয় রক্ষণশীলতার বেড়াজালে নিজের পরিচয় হারিয়ে না ফেলুক।
আজ যারা আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করে, ঘৃণা করে — তাদের মুখের সামনে দাঁড়িয়ে আমি বলতে চাই:
“আমি বাইসেক্সুয়াল। আমি গর্বিত। তোমরা যা-ই বলো না কেন, আমি আমার ভালোবাসার অধিকারে অটল।”
প্রত্যেককে বলছি — নিজের সত্যকে মেনে নাও। সমাজের চোখ রাঙানি, ধর্মের মুখোশ, আর কুসংস্কারের বেড়াজালকে ভেঙে বেরিয়ে আসো। নিজের অস্তিত্ব নিয়ে লজ্জিত নয়, গর্বিত হও।
পহেলা বৈশাখের সেই দিনটা ছিল আমার জন্য একটা বিপ্লব। আর আমি সেই বিপ্লবের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছি, মাথা উঁচু করে।